হাকালুকি হাওর-এ ধান ডুবতেই স্ট্রোক বর্গাচাষি বকুল দাসের, ঘরে খাবার নেই—বাবার ফেরার অপেক্ষায় তিন সন্তান

Spread the love

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হাকালুকি হাওরপাড়ের এক অসহায় পরিবারের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। হাওরের পানিতে বোরো ধান তলিয়ে যেতে দেখে স্ট্রোক করেছেন বর্গাচাষি বকুল দাস (৪৫)। বর্তমানে তিনি সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পাশে রয়েছেন স্ত্রী নিভা রানী দাস। আর বাড়িতে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের তিন সন্তানের।

জানা গেছে, পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের কালনীগড় গ্রামের বাসিন্দা বকুল দাস ভিটেমাটি না থাকায় পরের জমিতে বসবাস করেন। জীবিকার তাগিদে উপজেলা সদরের ভবানীগঞ্জ বাজারে একটি ছোট চায়ের দোকান চালানোর পাশাপাশি প্রতিবছর বর্গা জমিতে ধান চাষ করতেন।চলতি মৌসুমে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে প্রায় এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে হাকালুকি হাওরের পিংলা বিলের দুগাঙ্গা এলাকায় সাত বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন তিনি। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পাঁচ বিঘা জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়।

স্বজনরা জানান, ফসল নষ্ট হওয়ার দৃশ্য দেখে বাড়ি ফিরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বকুল। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে সিলেটে পাঠানো হয়। চিকিৎসকরা জানান, তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন।

বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট টিনশেড ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন পরিবারের সদস্যরা। উঠানে পড়ে থাকা ভেজা ধান শুকানোর চেষ্টা করছে সন্তানরা। এর মধ্যেই কিস্তির টাকা তুলতে বিভিন্ন এনজিও কর্মীরাও বাড়িতে আসছেন।

বকুলের বড় মেয়ে নীপা রানী দাস স্থানীয় তৈয়বুন্নেছা খানম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। আর্থিক সংকটে এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে পারেননি তিনি। ছেলে বিশাল দাস নবম শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে তিন্নি রানী দাস ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।

কাঁদতে কাঁদতে নীপা জানায়, বাবার চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে ঘরে থাকা সামান্য টাকাও শেষ হয়ে গেছে। এখন তারা কাকার পরিবারের সহায়তায় খাবার খাচ্ছে। অন্যদিকে দোকান বন্ধ থাকায় আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে।ছেলে বিশাল দাস জানায়, কয়েক দিন ধরে কিস্তির লোকজন বাড়িতে আসছেন। আগে চায়ের দোকান ও ধান বিক্রির টাকা দিয়ে বাবা কিস্তি দিতেন। এখন ফসল নেই, বাবাও অসুস্থ—কীভাবে ঋণের কিস্তি পরিশোধ হবে, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবারের।

পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মদনমোহন দাস বলেন, ওই এলাকার অধিকাংশ মানুষই দরিদ্র বর্গাচাষি। এবারের বন্যা ও পানিবন্দি পরিস্থিতিতে প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষি বিভাগের ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় বকুল দাসের নামও রয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত আড়াই হাজার কৃষকের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে জুড়ী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুশফিকীন নূর জানিয়েছেন, বকুল দাসের পরিবারের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *