কক্সবাজারের চকরিয়ায় এক পরিবারের ছয় ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রথমে সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হলেও, পরবর্তীতে তদন্তে সেটি ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঘটনাটির ভয়াবহ সত্য উদঘাটন করে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে পিবিআই প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শীর্ষক বইয়ে আলোচিত এই মামলার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।ঘটনাটি ঘটে ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে। একটি সবজি বোঝাই পিকআপের চাপায় হাসিনাপাড়ার সুরেশ চন্দ্র সুশীলের পাঁচ ছেলে—অনুপম সুশীল (৪৬), নিরুপম সুশীল (৪০), দীপক সুশীল (৩৫), চম্পক সুশীল (৩০) ও স্মরণ সুশীল (২৯) ঘটনাস্থলেই বা পরে মারা যান। গুরুতর আহত রক্তিম সুশীল (৩২) ১৪ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
এ ঘটনায় আহত হন আরও এক ভাই প্লাবন সুশীল (২৫) এবং বোন হীরা সুশীল (২৮)। পরে তারা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন।
মামলার নথি অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যরা তাদের পিতার মৃত্যুর দশম দিনের পূজা শেষে মহাসড়ক পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। ঠিক তখনই দ্রুতগতির একটি পিকআপ এসে তাদের চাপা দেয়। প্রথম ধাক্কার পর গাড়িটি একটি খুঁটিতে আঘাত করে থেমে যায়।
কিন্তু তদন্তে উঠে আসে আরও ভয়াবহ তথ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, চালক গাড়ি থামানোর পর আহতদের উদ্ধার না করে পুনরায় গাড়ি স্টার্ট দিয়ে পিছনে নেয় এবং একই আহতদের ওপর আবার চাপা দেয়। পরে সামনে এগিয়ে আরও কয়েকজনকে চাপা দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
প্রথমদিকে ঘটনাটি “সড়ক দুর্ঘটনা” হিসেবেই তদন্ত করা হয়। অজ্ঞাতনামা চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং মাত্র নয় দিনের তদন্তে থানা পুলিশ একজন চালককে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। নিহতদের অধিকাংশ মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়। একটি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত আঘাত ও রক্তক্ষরণের কথা উল্লেখ করা হয়।
তবে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলে তদন্তভার নেয় পিবিআই। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চালক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে পিকআপের মালিককেও গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তে পিবিআই দেখতে পায়, পিকআপটি ছিল ফিটনেসবিহীন, লাইসেন্সবিহীন এবং রুট পারমিট ছাড়া চলাচলরত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—প্রথম ধাক্কার পর চালকের আচরণ। আহতদের বাঁচানোর চেষ্টা না করে পুনরায় গাড়ি চালিয়ে তাদের ওপর চাপা দেওয়ার ঘটনাই তদন্তকে দুর্ঘটনা থেকে হত্যাকাণ্ডের দিকে নিয়ে যায়।
সব প্রমাণ ও আচরণগত বিশ্লেষণ শেষে পিবিআই চালকের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর পাশাপাশি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা অন্তর্ভুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করে। একইসঙ্গে পিকআপ মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও পৃথক অভিযোগ আনা হয়।
পরবর্তীতে আদালত চালককে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। অন্য দুই আসামির বিচার এখনও চলমান।পিবিআই বলছে, এই মামলা প্রমাণ করেছে—প্রথম দৃষ্টিতে যেটি দুর্ঘটনা মনে হয়, সঠিক তদন্ত, ঘটনাস্থল বিশ্লেষণ এবং অভিযুক্তের আচরণ মূল্যায়নের মাধ্যমে সেটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবেও উদঘাটন করা সম্ভব।
ডিএমএন/