রামুতে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার ১৪ বছর, এখনো শেষ হয়নি বিচার

Spread the love

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে ভয়াবহ হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ১৪ বছর পূর্ণ হলেও এখনো শেষ হয়নি ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময়েও মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা। দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করে হামলার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যাতে মামলায় হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামুতে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, ওই রাতে রামুর ১২টি বৌদ্ধ বিহার এবং ৩০টি বসতঘরে হামলা চালানো হয়। পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকাতেও বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার ঘটনা ঘটে।

তৎকালীন সময়ে উত্তম বড়ুয়া নামে এক বৌদ্ধ যুবকের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সহিংসতার সূত্রপাত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই অভিযোগের পর রামু, উখিয়া ও টেকনাফে একাধিক বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে। রামুর পাশাপাশি উখিয়া ও টেকনাফে সাতটি বৌদ্ধ বিহার ও ১১টি বসতঘরেও হামলার কথা মামলার তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে উঠে এসেছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি বৌদ্ধ বিহার ও শতাধিক বসতঘরে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে।

হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার ও বসতঘরগুলো পুনর্নির্মাণ করে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও অনেকটা ফিরে এসেছে। তবে হামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে এখনো সংশয় ও হতাশা রয়েছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাদের মধ্যে। তাঁদের কেউ কেউ প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে মামলাগুলোর পুনঃতদন্তের দাবিও জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রামু, উখিয়া ও টেকনাফে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার ঘটনায় মোট ২০টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে বাদীর সম্মতিতে একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত ৩৭৮ জনসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ হাজার ১৮২ জনকে আসামি করা হয়। পুলিশ ৯৩৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ শীলপ্রিয় মহাথের বলেন, ২০১২ সালের সহিংসতার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁরা সঠিক বিচার পাননি। হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের কাছে আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বিচারের নামে কোনো নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় ছাত্রনেতা মোহাম্মদুল হক জনি বলেন, রামুর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করে আসছেন। তাঁর ভাষ্য, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে যে হামলা হয়েছিল, তার সঙ্গে জড়িতদের বিচার এখনো হয়নি। নির্বাচিত সরকারের কাছে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

আইনজীবী শিপ্ত বড়ুয়া বলেন, রামুর বৌদ্ধ মন্দির ও বসতিতে হামলার ১৪ বছর পরও তাঁদের বিচার চাইতে হচ্ছে। হামলার সময়কার ছবি ও ভিডিওচিত্রকে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করে বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপক্ষের কাছ থেকে সাক্ষীর অভাবে বিচারকাজ থেমে থাকার কথা শোনা গেছে।

কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ১৪ বছরে এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরে এলেও মামলাগুলোর কার্যক্রম নিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে সংশয় রয়েছে। তাঁর দাবি, পুলিশ অভিযোগপত্র জমা দিলেও এখনো কোনো মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। রামুর ১৮টি মামলার বাদী পুলিশ হওয়ায় কারা আসামি হয়েছেন এবং কারা বাদ পড়েছেন, সে বিষয়েও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনেকের কাছে পরিষ্কার তথ্য নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু আরও বলেন, হামলার সময় যারা সামনে থেকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের অনেকের নাম অভিযোগপত্রে নেই বলে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঠেকাতে রামু হামলার একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

মামলাগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. ইউনুছ জানান, রামুর ঘটনায় দায়ের করা ১৮টি মামলার মধ্যে ১১টির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। উখিয়ার চারটি মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। বাকি তিনটি মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি তাঁর জানা নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মামলাগুলোর বিচার ধীরগতির হওয়ার কারণ হিসেবে মো. ইউনুছ দাবি করেন, আগের সরকারের হস্তক্ষেপে নিরপরাধ বিএনপি ও জামায়াতের লোকজনকে আসামি করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, এ কারণে সাক্ষ্যগ্রহণ চললেও সাক্ষীরা নিয়মিত আদালতে আসছেন না এবং এতে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এসব বক্তব্য তাঁর নিজস্ব দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; অভিযোগগুলোর সত্যতা মামলার নথি, সাক্ষ্য এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।

এদিকে রামু ট্র্যাজেডির ১৪ বছর পূর্তি উপলক্ষে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে রামু বুড্ডিস্ট সোশ্যাল মুভমেন্ট বাংলাদেশ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বুদ্ধ উপাসনা, পতাকা উত্তোলন, অষ্টশীল গ্রহণ, চিত্রাঙ্কন ও চিত্র প্রদর্শনী এবং চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী।

স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত বিহার ও বসতঘর পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে অবকাঠামোগত ক্ষত কিছুটা পূরণ হলেও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হবে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা প্রতিরোধে রামুর বৌদ্ধ বিহারগুলোতে সরকারি নিরাপত্তা আরও জোরদারের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *