পাবনার হিমাইতপুর শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ আশ্রমে উৎসব শুরু হতে তখনো দুই দিন বাকি। অথচ আশ্রমের সামনের সড়কের চিত্র দেখে বোঝার উপায় নেই যে মূল আয়োজন এখনো শুরু হয়নি। অটোরিকশা ও গাড়ির সারি, আর দেশ-বিদেশ থেকে দলে দলে আসছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা।
আশ্রমের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশের সময় হঠাৎ পথ আগলে দাঁড়ালেন একজন বৃদ্ধ। পরনে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি, চোখে চশমা, মুখভর্তি সাদা লম্বা দাড়ি। কাঁধে গামছা, পায়ে স্যান্ডেল। লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাবা, কোথায় যাবেন?’
পরিচয় জানতে চাইলে হাসিমুখে জানালেন, তিনি আশ্রমের গেটম্যান। দুই দিন পর শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ১৩৯তম আবির্ভাব দিবস উপলক্ষে উৎসব। এ সময় দেশ-বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমন ঘটে। আশ্রমের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় তাই প্রধান ফটকে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাকে।
অশীতিপর এই ব্যক্তি মো. আল্লেক আলী শেখ। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত তিনি। আশ্রমের সবার কাছে পরিচিত ‘আল্লেক চাচা’ নামে। ধর্মে মুসলিম হলেও দীর্ঘদিন ধরে একটি সনাতন ধর্মীয় আশ্রমের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন।
শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক সাধক। ১২৯৫ বঙ্গাব্দের ৩০ ভাদ্র পাবনা শহরের অদূরে হিমাইতপুরে তাঁর আবির্ভাব হয়। পরবর্তীতে সেখানেই গড়ে ওঠে সৎসঙ্গ আশ্রম। সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী প্রচারের কারণে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যেও তাঁর অনুসারী তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আশ্রমে বছরে দুটি বড় মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয় এবং এসব আয়োজনে বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটে।
হিমাইতপুরের পশ্চিমপাড়ার তৈয়জ্জদ্দিন শেখের ছেলে আল্লেক শেখ। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তার বাবা ছিলেন কৃষক। তৃতীয় শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবিকার প্রয়োজনে বাবার সঙ্গে ফসলের মাঠে কাজ শুরু করেন। হালচাষের পাশাপাশি একসময় গরুর গাড়িও চালিয়েছেন। হিমাইতপুর ও আশপাশের এলাকা থেকে গরুর গাড়িতে করে ইট পরিবহন এবং পাবনা শহর থেকে সিমেন্টসহ ভারী মালামাল আনা-নেওয়ার কাজও করেছেন।
পরবর্তীতে চাকায় লোহার রিং লাগানো গরুর গাড়ি নিষিদ্ধ হলে শহরের পিচঢালা রাস্তায় গাড়ি চালানো তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এরপর রাজমিস্ত্রির জোগালি হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিছু টাকা জমিয়ে একপর্যায়ে পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলে গরু কেনাবেচার ব্যবসায় যুক্ত হন।
গরু নিয়ে রাজশাহী থেকে ফেরার পথে একবার ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন আল্লেক। দুর্ঘটনায় তার কপালের হাড় ভেঙে ডান চোখের ভেতরে ঢুকে যায়। টানা নয় দিন অচেতন থাকার পর দীর্ঘ চিকিৎসায় সুস্থ হলেও ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারান তিনি।
এরপর শারীরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই তাকে কাজে নিতে চাইতেন না বলে জানান আল্লেক। শেষ পর্যন্ত তার আশ্রয় হয় হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমে। সময়টা ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে। তখন আশ্রমের অবকাঠামোও ছিল বেশ সাধারণ। দৈনিক মজুরি হিসেবে পেতেন মাত্র তিন টাকা।
কাজে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, যে আলুর বস্তা সরাতে দুই-তিনজন শ্রমিকের প্রয়োজন হতো, আল্লেক চাচা অনেক সময় একাই তা পিঠে তুলে মন্দির চত্বর থেকে গোডাউনে নিয়ে যেতেন। আশ্রমে শ্রম দেওয়ার পাশাপাশি বিস্তীর্ণ জমিতে হালচাষ করেছেন এবং নিজ হাতে মেহগনির বাগান গড়ে তুলেছেন। সেই গাছগুলো এখন বড় বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
আশ্রমের প্রতি তার দায়িত্ববোধ শুধু শ্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একসময় আশ্রমের প্রার্থনা মন্দিরের ভবন নির্মাণকাজ অর্থসংকটে থমকে যায়। তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকের অনুরোধে আল্লেক তার ভাইদের ইটভাটা থেকে এক লাখ ইট বাকিতে এনে দেন। উৎসবের আগে ওই ইট সরবরাহ মন্দির নির্মাণকাজ এগিয়ে নিতে সহায়তা করে।
আশ্রমের বর্তমান সীমানার মধ্যে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া প্রায় এক বিঘা জমিও ছিল আল্লেকের। কোনো আর্থিক দাবি ছাড়াই তিনি জমিটি আশ্রমের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন। পরে আশ্রম কর্তৃপক্ষ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাকে ওই জমির সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করে।
দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কের কারণে আশ্রম কর্তৃপক্ষও আল্লেকের পাশে থেকেছে। কয়েক বছর আগে তাদের সহায়তায় তার বাঁ চোখের অস্ত্রোপচার করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান।
আল্লেক শেখ বলেন, অভাবের সময়ে আশ্রম কর্তৃপক্ষ যেভাবে তার পাশে থেকেছে, তা তিনি কখনো ভুলতে পারবেন না। আশ্রমের মানুষ তাকে ভালোবাসেন ও সম্মান করেন। তাই এত বছর পরও এই জায়গার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা ভাবতে পারেন না।মু
সলিম হয়েও সনাতন ধর্মীয় আশ্রমে কাজ করার কারণে বিভিন্ন সময়ে মানুষের কটূক্তি শুনতে হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে এসব কথায় তিনি গুরুত্ব দেন না। তার ভাষায়, মানুষের সেবার ক্ষেত্রে ধর্ম কোনো বাধা হওয়া উচিত নয়। আশ্রমের মানুষ তাকে যে সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছেন, সেটিই তার কাছে বড় বিষয়।
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী আল্লেক শেখের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১ জানুয়ারি। সে হিসাবে তার বয়স ৮০ বছর। এই বয়সেও নিয়মিত আশ্রমে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে আশ্রমে আসেন এবং সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। পান, চা, বিড়ি বা তামাকজাতীয় কোনো কিছুই তিনি সেবন করেন না। ধর্মীয় বিধান পালনের ক্ষেত্রেও তিনি নিয়মিত। দায়িত্ব পালনের সময়ও নামাজ আদায় করেন।
আল্লেক বলেন, “নামাজের সময় নামাজ, কাজের সময় কাজ। আশ্রমের সবাই বরং নামাজ আদায়ে উৎসাহ দেয়।”করোনাভাইরাসের সময় থেকে আশ্রমের প্রধান ফটকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। মন্দিরের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তিনি তরুণ-তরুণীদের অহেতুক আড্ডা এবং মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশে বাধা দেন।
শুধু প্রধান ফটক নয়, আশ্রমের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের নিরাপত্তার দায়িত্বও দীর্ঘদিন ধরে পালন করে আসছেন আল্লেক। শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্মভিটা ও আশ্রমের পবিত্র স্থানের একটি অংশ বর্তমানে পাবনা মানসিক হাসপাতালের সীমানার মধ্যে পড়েছে। প্রতিবছর সেখানে ঠাকুরের জন্মভিটায় তুলসীগাছ রোপণ করেন তিনি। বার্ষিক উৎসবের সময় সেখানে দানবাক্স স্থাপন করা হলে সেটি দেখভালের দায়িত্বও দেওয়া হয় তাকে। দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ততার কারণে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তিনি সেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
আশ্রম কর্তৃপক্ষের কাছে আল্লেক শেখ কেবল একজন কর্মচারী নন, বরং একজন পিতৃতুল্য অভিভাবক। পাবনা সৎসঙ্গ আশ্রমের সহঋত্বিক পুরোধা কল্যাণ কুমার বিশ্বাস তাকে আশ্রমের ‘রক্ষণভাগের খেলোয়াড়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, আল্লেক চাচা আশ্রমের দীর্ঘ ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী এবং ঠাকুরের জন্মভূমির প্রতি তার মমতা অতুলনীয়।
আশ্রমের সাংস্কৃতিক সম্পাদক বাউল রথীন মিত্র বলেন, অনুকূল ঠাকুরের ‘মানুষ আপন টাকা পর/যত পারিস মানুষ ধর’ বাণীর একটি মূর্ত প্রতীক আল্লেক চাচা। তার ভাষায়, আল্লেককে শুধু গেটম্যান হিসেবে দেখলে তার ভূমিকার পূর্ণতা বোঝা যাবে না; তিনি আশ্রমের মানুষের কাছে পিতৃতুল্য ও পরমাত্মীয়।
আশ্রমের নির্বাহী কমিটির সদস্য মুকুল বর্ধন জানান, আশ্রমের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে আল্লেক সবসময় সতর্ক থাকেন।আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক তাপস চন্দ্র বর্মণ বলেন, যতদিন আল্লেক কাজ করতে পারবেন, ততদিন তিনি কাজ করবেন। অবসরের পর তার জন্য সম্মানির ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে জীবনের বাকি সময়টা তিনি ভালোভাবে কাটাতে পারেন।
বর্তমানে খাদ্যভাতাসহ মাসে আট হাজার টাকা বেতন পান আল্লেক শেখ। তবে এই আয় দিয়ে সংসার চালাতে তাকে হিমশিম খেতে হয়। তাই বেতন কিছুটা বাড়ানোর প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি।
আশ্রম থেকে বিদায়ের সময়ও প্রধান ফটকে দায়িত্ব পালন করছিলেন আল্লেক শেখ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই পবিত্র ভূমির সেবা করে যেতে চান তিনি। তার এই দীর্ঘ সেবা, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতার ঊর্ধ্বে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ এবং আশ্রমের প্রতি অটুট আনুগত্য আবহমান বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।