ঝালকাঠি শহরের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজ জয় নারায়ণ ঘোষালের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বারচালা বা নাটমন্দির ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয় নাগরিক, সংস্কৃতিপ্রেমী ও সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বহু ঐতিহাসিক ঘটনা, রাজনৈতিক সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষী এই স্থাপনাটি সংরক্ষণের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সনাতন ধর্মীয় স্থাপত্যে নাটমন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত। মূল মন্দিরের সম্মুখভাগে অবস্থিত এই উন্মুক্ত বা আধা-উন্মুক্ত মণ্ডপে অতীতে নৃত্য, সংগীত, নাট্যাভিনয়, কীর্তনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। ‘নাট’ অর্থ নৃত্য বা অভিনয় এবং ‘মন্দির’ অর্থ গৃহ বা স্থান—এই দুই শব্দের সমন্বয়ে ‘নাটমন্দির’ শব্দটির উৎপত্তি। প্রাচীনকাল থেকে দেবদাসীদের নৃত্য পরিবেশন, ভক্তিমূলক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই স্থাপনাগুলো।
স্থানীয়দের মতে, ঝালকাঠির বারচালা শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘ সময় ধরে এটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, যাত্রাপালা, ধর্মীয় সমাবেশ এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের উন্মুক্ত মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, এই বারচালা নাটমন্দিরে বিভিন্ন সময়ে দেশের খ্যাতিমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আগমন ঘটেছিল। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসসহ অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা এখানে সভা-সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, এমন একটি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কী এবং তা কার স্বার্থে করা হচ্ছে? তাদের মতে, যদি স্থাপনাটি জরাজীর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে ভেঙে ফেলার পরিবর্তে সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীরা আরও দাবি করেন, পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন, ১৯৬৮-এর আলোকে ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই বারচালা নাটমন্দিরের ঐতিহাসিক মূল্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এর ধ্বংস নয়, বরং সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দারা ঝালকাঠি শহরের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার স্বার্থে বারচালা নাটমন্দির ভাঙার যেকোনো উদ্যোগ বন্ধ করে দ্রুত সংরক্ষণ ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
ডিএমএন/