গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে নির্মাণাধীন রামমন্দির ও রামের মূর্তিকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে লেখিকা, চিকিৎসক, নারীবাদী, মানবতাবাদী ও মানবাধিকারকর্মী তসলিমা নাসরিন একটি দীর্ঘ মতামত প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের অধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
তসলিমা নাসরিন তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ মসজিদ রয়েছে এবং দেশের নানা প্রান্তে প্রতিনিয়ত নতুন মসজিদও নির্মিত হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি রামমন্দির বা রামের মূর্তি নির্মাণ নিয়ে এত আপত্তি কেন? তার মতে, যদি ধর্মীয় স্বাধীনতা সত্যিই সবার জন্য হয়, তবে তা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর জন্য নয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
তিনি দাবি করেন, গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে নির্মাণাধীন রামমন্দিরকে কেন্দ্র করে যেসব হুমকি, উস্কানি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য শোনা যাচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনো ধর্মীয় স্থাপনা পছন্দ না করলেই সেটি ভেঙে ফেলার অধিকার রাখে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, আইনের শাসনসম্পন্ন রাষ্ট্রে ধর্মীয় বিরোধের সমাধান হিংস্রতা, ভাঙচুর বা বর্বরতার মাধ্যমে হতে পারে না।
লেখিকা আরও উল্লেখ করেন, পলাশবাড়ী এলাকায় অতীতেও হিন্দু মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয় বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ তুলে ধরে তসলিমা নাসরিন বলেন, বিশ্বের বহু মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ যেমন ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া এবং ওমান-এ বড় বড় হিন্দু মন্দির রয়েছে। সেসব দেশে মন্দিরের অস্তিত্ব রাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়। তাই বাংলাদেশে একটি মন্দির নির্মাণকে কেন কেউ কেউ অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছেন, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
তার বক্তব্যে আরও বলা হয়, হিন্দুবিদ্বেষ, মুসলিমবিদ্বেষ, ইহুদিবিদ্বেষ কিংবা খ্রিস্টানবিদ্বেষ—যে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষই একটি সভ্য সমাজের জন্য ক্ষতিকর। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং যারা সহিংসতা বা ভাঙচুরের হুমকি দেয় তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা।
রামমন্দির ভাঙার দাবি প্রসঙ্গে তসলিমা নাসরিন বলেন, এ ধরনের মানসিকতা তালিবানি চিন্তাধারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি ২০০১ সালে আফগানিস্তানে বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস-এর ঘটনার উদাহরণ টেনে বলেন, তখন তালেবান ভিন্ন ধর্মের ঐতিহ্য ও প্রতীককে মেনে নিতে না পেরে ঐতিহাসিক বুদ্ধমূর্তিগুলো ধ্বংস করেছিল। আজ যদি কেউ গাইবান্ধার নির্মাণাধীন রামমন্দির বা রামের মূর্তি ভেঙে ফেলার হুমকি দেয়, তাহলে সেই মানসিকতার সঙ্গে বামিয়ানের ঘটনার একটি স্পষ্ট সাদৃশ্য দেখা যায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ধর্মে অবিশ্বাসী হলেও মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, যতক্ষণ সেই বিশ্বাস অন্য মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ক্ষতির কারণ না হয়।
তসলিমা নাসরিনের মতে, মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা বৌদ্ধবিহার ধ্বংস করা নয়; বরং সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে কারও মসজিদ যেমন সুরক্ষা পাবে, তেমনি কারও মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, সিনাগগ বা বৌদ্ধবিহারও সমানভাবে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে। এটিই আইনের শাসনের মৌলিক দাবি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ডিএমএন/