জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) কেন্দ্রীয় মন্দির স্থাপনের জন্য প্রস্তাবিত স্থানে শৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগের প্রতিবাদে এবং দ্রুত মন্দির নির্মাণের দাবিতে দিনভর অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা। তবে সারাদিন কর্মসূচি চললেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত নিজ উদ্যোগে ভিত্তিপূজার মাধ্যমে ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মন্দির’ উদ্বোধনের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার (তারিখ) দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়, যা রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত চলে। কর্মসূচি শেষে শিক্ষার্থীরা দেবদেবীর ছবি, পূজাসামগ্রী ও প্রদীপ নিয়ে প্রস্তাবিত স্থানে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপূজা সম্পন্ন করেন এবং সেখানে রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
প্রশাসনের উদাসীনতায় ক্ষোভ
বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী উজ্জ্বল চন্দ্র দাস বলেন,
“আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের কাছে কেন্দ্রীয় মন্দির স্থাপনের যৌক্তিক দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু তারা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত সেখানে শৌচাগার নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। সারাদিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেও যখন কোনো সাড়া পেলাম না, তখন বাধ্য হয়েই আমরা সকল আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় মন্দির স্থাপন করেছি। আজ আমরা সারারাত এখানেই থাকব।”
স্লোগানে মুখর মুক্তমঞ্চ
দিনভর অবস্থান কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা
‘এক, দুই, তিন, চার—মন্দির আমার অধিকার’,
‘প্রশাসন লজ্জা লজ্জা’,
‘মন্দির আমার অধিকার—রুখে দেবে সাধ্য কার’
সহ বিভিন্ন স্লোগানে মুক্তমঞ্চ মুখর করে তোলেন।
সনাতনী শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি
জবি শাখা শ্রীচৈতন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংঘের সাধারণ সম্পাদক অজয় পাল বলেন,
“আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ জন সনাতনী শিক্ষার্থী রয়েছে। অথচ এখনো কোনো কেন্দ্রীয় মন্দির নেই। আমরা বারবার স্মারকলিপি দিয়েছি। উপাচার্য মহোদয় প্রথমে জায়গা নেই বলে জানান। পরে আমরা মুক্তমঞ্চের পাশের জায়গা দেখিয়ে দিলে সেখানে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।”
ছাত্র ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রিয়ন্ত স্বর্ণকার বলেন,
“আমাদের না জানিয়েই মন্দিরের প্রস্তাবিত স্থানে টয়লেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং স্পষ্ট অবমাননার শামিল। তাই আমরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি।”

ভিত্তিপূজার ঘোষণা আগেই
জবি সনাতন বিদ্যার্থী সংসদের সভাপতি সুমন কুমার দাস বলেন,
“আমরা প্রশাসনের কাছ থেকে মন্দির নির্মাণের অনুমতি চাই। যদি তারা ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা নিজেরাই ভিত্তিপূজা সম্পন্ন করব এবং কেন্দ্রীয়ভাবে মন্দির নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করব।”
তিনি জানান, প্রশাসনের কোনো সাড়া না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা সেই ঘোষণাই বাস্তবায়ন করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দা
মন্দিরের প্রস্তাবিত জায়গায় শৌচাগার নির্মাণের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দা জানিয়েছেন জকসু ছাত্রদল–ছাত্র অধিকার প্যানেলের নির্বাচিত দুজন সম্পাদক এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
জকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাকরিম আহমেদ বলেন,
“ক্যাম্পাসে একটি মন্দির স্থাপনের দাবি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সনাতনী শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার। প্রস্তাবিত জায়গায় ওয়াশরুম নির্মাণের সিদ্ধান্ত শুধু অসংবেদনশীল নয়, এটি তাদের অনুভূতির প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা।”
জকসুর পরিবহন সম্পাদক মাহিদ হোসেন বলেন,
“বারবার জায়গার সংকুলান ও অর্থের অজুহাত দেখিয়ে সনাতনী শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ তাদের প্রস্তাবিত জায়গায় চারটি টয়লেট নির্মাণ করা হচ্ছে, যা স্পষ্টতই বিমাতাসুলভ আচরণ।”

জকসুর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
সারাদিন অবস্থান চললেও কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ দায়িত্বশীলদের উপস্থিতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থী অবন্তী রায় বলেন,
“আমরা ২১ জন প্রতিনিধি নির্বাচন করেছিলাম। কিন্তু সারাদিনে মাত্র দুই-তিনজনকে পেয়েছি। বাকিরা অন্য অনুষ্ঠানে গেলেও আমাদের সঙ্গে দেখা করেননি। তাহলে কি আমরা ধরে নেব—সনাতনীদের ছাড়াই জকসু হয়েছে?”
প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও দাবির বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম এবং জকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলীম আরিফকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
ডিএমএন/