মতামত | এডভোকেট সুশান্ত অধিকারী
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এক অবিচ্ছেদ্য ধারাবাহিকতা। এই প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবময়।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য হিন্দু মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখসারিতে থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। অসংখ্য মা-বোন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং বহু তরুণ প্রাণ দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। তাদের এই ত্যাগের পূর্ণাঙ্গ হিসাব আজও জাতির কাছে নেই। কারণ মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের জন্য ছিল না; এটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির অস্তিত্ব, মর্যাদা ও স্বাধীনতার সংগ্রাম।
স্বাধীন বাংলাদেশের মূল চেতনা ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করা। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, পাহাড়ি ও সমতলের মানুষ—সকলের সম্মিলিত আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীনতা। সংবিধান ও রাষ্ট্রের আদর্শও বলে—ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তা, সমঅধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। স্বাধীনতার সময় দেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। এর পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা কারণ নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো নাগরিক যেন তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়, অনিশ্চয়তা বা বৈষম্যের শিকার না হন।
সম্প্রতি গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে হরিদাস চন্দ্র তরুণী দাসের উদ্যোগে রামমূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক ও বাধার সৃষ্টি হয়েছে, তা নতুন করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। যদি দেশের প্রচলিত আইন, প্রশাসনিক বিধি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে কোনো ধর্মীয় স্থাপনা বা প্রতীক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে তার বিরোধিতার কারণ কী? কেন একজন নাগরিক তার ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী উপাসনা বা ধর্মীয় অনুশীলন করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হবেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার সময় আমাদের রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পথে না গিয়ে সাংবিধানিক অধিকার, মানবিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় সহনশীলতার আলোকে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। ইসলামসহ বিশ্বের সব প্রধান ধর্মই শান্তি, সহাবস্থান, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা দেয়। তাই কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকারকে সংকুচিত করা কখনোই একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গঠনের পথ হতে পারে না।
বাংলাদেশের শক্তি তার বৈচিত্র্যের মধ্যে নিহিত। এ দেশে যুগের পর যুগ মসজিদের আজান, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, গির্জার প্রার্থনা এবং বৌদ্ধবিহারের শান্তির বাণী পাশাপাশি উচ্চারিত হয়েছে। এই ঐতিহ্যই বাংলাদেশের অন্যতম সৌন্দর্য এবং সম্পদ। এই সম্প্রীতির ঐতিহ্য রক্ষা করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন হলে তা শুধু একটি গোষ্ঠীর ক্ষতি নয়; বরং তা রাষ্ট্রের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধের জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
আসুন, আমরা সবাই আইনশৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকি, গুজব ও উসকানি থেকে দূরে থাকি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি। কারণ এই দেশ কোনো একক সম্প্রদায়ের নয়—এটি সকল নাগরিকের, সকল ধর্মের এবং সকল মানুষের বাংলাদেশ।