‘আমি চলে গেলে আমার ছেলেও বাঁচবে না’—মৃত্যুর আগে চিন্ময়ের মায়ের আকুতি

Spread the love

বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মা সন্ধ্যা রাণী ধর (৭১) মারা গেছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা অবস্থায় কারাবন্দী ছোট ছেলে চিন্ময়কে শেষবারের মতো চোখের দেখা দেখার আকুতি জানিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার আগেই বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মেখল পুণ্ডরীক ধামে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

সন্ধ্যা রাণীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার বড় ছেলে রঞ্জন কুমার ধর। তিনি জানান, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তাদের মা। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে পুণ্ডরীক ধামে নিয়ে আসার পর বৃহস্পতিবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, হৃদরোগ, ফুসফুসে সংক্রমণ ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন সন্ধ্যা রাণী। এক মাসের বেশি সময় ধরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত শনিবার তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছিল।

গুরুতর অসুস্থ মাকে শেষবারের মতো দেখতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে প্যারোলে মুক্তির আবেদন জানিয়েছিল পরিবার। এ জন্য তার বড় ছেলে রঞ্জন কুমার ধর গত ৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার কাছে আবেদন করেন। এর আগে কারা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির কাছেও আবেদন করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।

তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অসুস্থ স্বজনকে দেখতে প্যারোল দেওয়ার আইনি সুযোগ নেই। তবে নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুর পর শেষ বিদায় ও ধর্মীয় আচার পালনের জন্য প্যারোল দেওয়ার বিধান রয়েছে।

অসুস্থ অবস্থায় প্রায় এক মাস আগে নিজের শারীরিক পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটি ভিডিওবার্তায় ছেলেকে একবার দেখার আকুতি জানিয়েছিলেন সন্ধ্যা রাণী। ভিডিওবার্তায় তিনি চিন্ময়কে মুক্ত করে অন্তত তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেন।

ওই ভিডিওবার্তায় সন্ধ্যা রাণী বলেন, তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ এবং তিনি কতদিন বেঁচে থাকবেন তা জানেন না। ছেলেকে দীর্ঘদিন ধরে দেখতে না পাওয়ার কষ্টের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, মৃত্যুর আগে একবার ছেলের মুখ দেখতে চান। চিন্ময়কে মুক্তি দেওয়া হলে দেশবাসী আনন্দিত হবে বলেও তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

মৃত্যুর আগে দেওয়া সেই ভিডিওবার্তায় তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চিন্ময়ের জন্য দুশ্চিন্তায় তার খাওয়া-দাওয়া ব্যাহত হচ্ছে এবং চিকিৎসার জন্য একাধিক হাসপাতালে যেতে হয়েছে। ছেলের সঙ্গে দেখা করার আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বারবার অনুরোধ জানান।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারাগারে থাকা ছেলের সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি। বৃহস্পতিবার সকালে পুণ্ডরীক ধামেই তার মৃত্যু হয়।রঞ্জন কুমার ধর বলেন, “বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমার মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর চিকিৎসা শেষে তাকে পুণ্ডরীক ধামে নিয়ে আসা হয়েছিল।”

পুণ্ডরীক ধাম সূত্রে জানা গেছে, ধর্মীয় আচারাদি পালনের পর সেখানেই সন্ধ্যা রাণী ধরকে সমাধি দেওয়ার কথা রয়েছে। ধর্মীয়ভাবে তিনি ‘শ্রীমতি সখী রসমঞ্জুরী মাতাজি’ নামে পরিচিত ছিলেন।

সন্ধ্যা রাণীর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন সনাতনী অধিকার আন্দোলন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক পলাশ সেন। তিনি বলেন, গুরুতর অসুস্থ মায়ের সঙ্গে শেষবার দেখা করার সুযোগ চিন্ময় না পাওয়ায় তারা ব্যথিত। চিন্ময়ের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোকে তারা মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ নয়, মামলাগুলোর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং চিন্ময়ের ন্যায়সংগত আইনি অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

পলাশ সেন আরও বলেন, মৃত্যুর আগে একজন মায়ের সন্তানের মুখ দেখার আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়াকে তারা বেদনাদায়ক মনে করেন। চিন্ময়ের দ্রুত আইনগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত ও মুক্তির দাবিও জানান তিনি।

এদিকে আজ বিকেলে পুণ্ডরীক ধামে মায়ের ধর্মীয় আচার ও সমাধি অনুষ্ঠানে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস উপস্থিত থাকতে পারবেন কি না, সে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন তার স্বজন ও অনুসারীরা।

পারিবারিকভাবে জানা যায়, তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী সবার ছোট। তার বাবা আশুতোষ ধর। তার বড় ভাই রঞ্জন কুমার ধর, মেজো ভাই অঞ্জন কুমার ধর এবং বোন রুনা ধর। তাদের পারিবারিক শিকড় চট্টগ্রামের সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের করইয়ানগর এলাকায়। পরবর্তীতে পরিবার চট্টগ্রাম নগরে চলে আসে। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস পরবর্তীতে হাটহাজারীর পুণ্ডরীক ধামের সঙ্গে যুক্ত হন।

চিন্ময়ের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হয়। মামলায় চিন্ময়সহ ১৯ জনকে আসামি করা হয়। চান্দগাঁও মোহরা ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খান বাদী হয়ে মামলাটি করেন। পরে ২৫ নভেম্বর ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরদিন তাকে চট্টগ্রাম আদালতে হাজির করা হলে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

সন্ধ্যা রাণীর মৃত্যুতে স্বজন, অনুসারী ও সনাতনী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মহলে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। ছেলেকে শেষবারের মতো দেখার যে আকুতি নিয়ে জীবনের শেষ সময় পার করেছেন তিনি, সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়ার বিষয়টিই তার মৃত্যুর পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *