কিশোরগঞ্জের কৃষ্ণপুর গণহত্যা: ১৯৭১ সালে প্রাণ হারান বহু নিরীহ মানুষ

Spread the love

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত কৃষ্ণপুর গ্রামে সংঘটিত হয় এক ভয়াবহ গণহত্যা। পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকারদের হামলায় সেদিন প্রাণ হারান গ্রামের বহু নিরীহ মানুষ। একই সঙ্গে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং নারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে অষ্টগ্রাম উপজেলার পাকবাহিনীর ক্যাম্প থেকে একদল পাকিস্তানি সেনা কৃষ্ণপুর গ্রামে প্রবেশ করে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় রাজাকারদের একটি দল। এরপর গ্রামের পুরুষদের একত্র করে স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়।

পরবর্তীতে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। এতে বিপুলসংখ্যক নিরীহ মানুষ নিহত হন বলে স্থানীয় ইতিহাস ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে। তবে বিভিন্ন স্থানীয় সূত্রে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে—কোথাও ১২৭ জন, আবার কোথাও ১৩১ জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

হামলার সময় গ্রামের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয় বলেও স্থানীয়দের দাবি। আতঙ্কে প্রাণ বাঁচাতে গ্রামের কয়েকশ মানুষ পুকুরের কচুরিপানার আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন বলে জানা যায়।

স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী, ওই সময় গ্রামের নারীরাও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের নির্যাতনের শিকার হন। একাত্তরের সেই ভয়াবহতার স্মৃতি আজও কৃষ্ণপুরের মানুষের কাছে বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে।

গণহত্যায় নিহত সবার নাম-পরিচয় সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত একটি তালিকায় ৪৭ জনের নাম পাওয়া যায়। তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—কালী দাস রায়, ডা. ননী রায়, রাধিকা মোহন রায়, গোপী মোহন সূত্রধর, সুনীল শর্মা, মুকুন্দ সূত্রধর, যোগেন্দ্র সূত্রধর, মহেন্দ্র রায়, অনিল মাঝি, চন্দ্র কুমার রায়, জয় কুমার রায়, শান্ত রায়, কিশোর রায়, ননী চক্রবর্তী, সুনীল চক্রবর্তী, ব্রজেন্দ্র দাস, জগদীশ দাস, ইশান দাস, ধীরেন্দ্র রায়, হরিচরণ রায়, মদন রায়, দাশু শুক্লবৈদ্য, হরি দাশ রায়, শব লঞ্জন রায়, রামাচরণ রায়, ডা. অবিনাশ রায়, শৈলেস রায়, ক্ষিতিশ গোপ, নীতিশ গোপ, হীরা লাল গোপ, প্যারি দাস, সুভাষ সূত্রধর, প্রমোদ দাস, সুদর্শন দাস, গোপাল রায়, দীগেন্দ্র আচার্য্য, রেবতী রায়, শুকদেব দাস, দীনেশ বিশ্বাস, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, রস রাজ দাস, জয় গোবিন্দ্র দাস, বিশ্বনাথ দাস, মহাদেব দাশ, মহেশ দাস, শবরঞ্জন রায় ও মনোরঞ্জন বিশ্বাস।

কৃষ্ণপুরের এই হত্যাকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত নৃশংসতার একটি স্মারক হিসেবে স্থানীয়দের কাছে বিবেচিত হয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ, নিহতদের নাম-পরিচয় পূর্ণাঙ্গভাবে নথিভুক্ত করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এসব ঘটনার ইতিহাস তুলে ধরার দাবি রয়েছে স্থানীয়দের।

ডিএমএন/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *